বাঙালির রান্না ঘরে কালো জিরে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান । কালো জিরে অনেক ঔষুধি গুনের ভাণ্ডার । প্রত্যেকের রান্না ঘরেই কালো জিরে থাকে যা খাবারকে সুবাসিত করে । এই মশলা রান্নায় স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি ওষুধি ও ভেষজ গুনের আধার । সাধারণড়েইলো জিরে নামে পরিচিত হলেও এর আরো কিছু নাম রয়েছে – যেমন রোমান করিয়েণ্ডার বা রোমান ধনে , নিজেলা , হাব্বাটুসউডা , কালো কেওড়া , ফিনেল ফ্লাওয়ার ও কালঞ্জি ইত্যাদি । কালো জিরের বৈজ্ঞানিক নাম হল nigella sative । যে নামেই ডাকা হোক না কেন এই কালো জিরের স্বাস্থ্য উপকারিতা অপরিসীম । বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রোগ সারাতে কালো জিরে ব্যবহার করা হয় ।

কালো জিরে একটি বিশেষ ভেষজ খাবার যা সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে । এই কালো জিরে যেমন আমাদের প্রতিদিনের খাবারের একটি অনন্য অংশ হতে পারে , তেমনি আমাদের নানা ধরনের রোগ থেকে আমাদের শরীরকে ভিতর থেকে রক্ষা করে । কালো জিরে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নিধন থেকে শুরু করে শরীরের কোষ ও কলার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে । কালো জিরে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যের জন্যই নয় বরং চুল এবং ত্বকের জন্য বেশ উপকারি ।

এটি পুষ্টি গুনে ভরপুর । কালো জিরেতে থাকে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন বি , ফসফেট , ভিটামিন এ , ক্যালসিয়াম , ফসফরাস , ভিটামিন সি , কার্বোহাইড্রেট আয়রন , সোডিয়াম , প্রোটিন , ফাইবার , অ্যামাইনো অ্যাসিড , ফ্যাটি অ্যাসিড -সহ একাধিক পুষ্টি উপাদান । কালো জিরের তিনটি প্রধান প্রাকৃতিক রাসায়নিক পদার্থ সমৃদ্ধ । যেমন – থাইমোকুইনোন , থাইমোহাইড্রোকুইনোন এবং থাইমোল । এছাড়া এতে আছে অ্যান্টিঅক্সডেণ্ট এবং অ্যান্টি – ইনফ্লেমেটরি গুন ।
কালো জিরের উপকারিতা —–
১। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ঃ কালো জিরেতে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেণ্ট , যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে । নিয়মিত কালো জিরে খেলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সতেজ থাকে । এতে করে যেকোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেহকে প্রস্তুত করে তোলে এবং সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি করে । এক চামচ কালো জিরে অথবা কালো জিরের কয়েক ফোটা তেল এবং এক চামচ মধু দিয়ে একসাথে খেলে তা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে ।

২। হৃদরোগে প্রতিরোধ করে ঃ কালো জিরেতে আছে ওমেগা -৩ ও ওমেগা -৬ ফ্যাটি অ্যাসিড , যা হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে । যাদের হৃদরোগ আছে , তারা সুস্বাস্থ্য পেতে কালো জিরে মেশানো দুধ খেতে পারেন । হৃদরোগের কষ্ট কমার পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা এটি কমিয়ে আনবে অনেকটাই ।
৩। মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায় ঃ কালো জিরেয় থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেণ্ট এবং প্রদাহ প্রতিরোধী উপাদান মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে । কালো জিরে মস্তিস্কের স্নায়ুতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় ।
৪। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে ঃ কালো জিরে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে । যে কোনো পানীয়ের সঙ্গে আধা চামচ কালো জিরে মিশিয়ে খেলেই তা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখবে ।

৫। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে ঃ কালো জিরে নিজেই একটি অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিসেপটিক । মস্তিস্কের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির মাধ্যমে স্মরন শক্তি বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে । কালো জিরে খেলে আমাদের দেহে রক্ত সঞ্চালন ঠিকমতো হয় । যা আমাদের স্মৃতি শক্তি বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে । এছাড়া , কালো জিরে মেধার বিকাশের জন্য কাজ করে দ্বিগুণ হারে ।
৬। হজম শক্তি বৃদ্ধি করে ঃ এতে থাকা ফাইবার ও অন্যান্য উপাদান হজম শক্তি বৃদ্ধি করে এবং পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে । নিয়মিত খেলে পেটের সমস্যা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায় , যেমন – কোষ্ঠকাঠিন্য । এছাড়া , কালো জিরে পেটের গ্যাস , বদহজম এবং অ্যাসিডিটির মতো সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে ।

৭। দাঁতের জন্য উপকারী ঃ কালো জিরে খেলে দাঁত সম্পর্কিত অনেক সমস্যা দূর করে , যেমন – মাড়িতে ফোলাভাব এবং রক্তপাত ।
৮। ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে ঃ কালো জিরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করতে খুবই উপকারী । এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেণ্ট বৈশিষ্ট্য যা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধ করতে সাহায্য করে । গবেষণায় দেখা গেছে ,কালো জিরে থাকা থাইমোকুইনোন ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধ করতে সক্ষম । বিশেষত স্তন , প্রোস্টেট এবং কোলন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে কালো জিরের সক্রিয় উপাদানগুলো কার্যকর হতে পারে । কালো জিরে লিভার ক্যান্সারের জন্য দায়ী । কারণ , এটি আলফা টক্সিন নামক বিষ ধ্বংস করে । তাই যারা লিভার ক্যান্সারে অক্রান্ত রোগীদের জন্য এটি একটি মহৌষধ ।

৯। ওজন কমাতে সাহায্য করে ঃ এতে থাকা উপাদানগুলি শরীরের মেটাবলিজাম বাড়ায় এবং চর্বি পোড়াতে সাহায্য করে । যারা মেদ কমাতে চান , তাদের জন্য সকালে কালো জিরে খাওয়া খুবই উপকারী । চায়ের সাথে কালো জিরে মিশিয়ে খেলে তা বাড়তি মেদ ঝরে যেতে সাহায্য করে ।