তেলাকুচো একপ্রকারের লতাজাতীয় ভেষজ উদ্ভিদ । এই গাছ বসতবাড়ির আশেপাশে , রাস্তার পাশে , বন – জঙ্গলে জন্মায় এবং সেখানেই বংশবিস্তার করে । একেক দেশে একেক নামে ডাকা হয় । এর প্রচলিত নাম হল তেলাকুচো , তোড়নি শাক , কুদরি । স্থায়ীভাবে একে কুচিলা , তেলাকচু , তেলাচোরা , তেলাকুচা , তেলাহলি ইত্যাদি নামে ডাকা হয় । কিছু এলাকায় এই গাছের পাতাগুলিকে শাক হিসেবে খেয়ে থাকে । এই গাছের পাতা পঞ্চভূজ আকারের হয় এবং পাতা ও লতার রং সবুজ । গাঢ় সবুজ রঙের নরম পাতা এবং কাণ্ডবিশিষ্ট একটি লতাজাতীয় বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ এটি । বিভিন্ন গাছের উপর ভর করে তেলাকুচা বাড়তে পারে । এই গাছটি লতার কাণ্ড থেকে আকশীর সাহায্যে অন্য গাছকে জড়িয়ে উপরে ওঠে ।

থাইল্যান্ডে এটি চাষ হয় এবং সেখানে এটি বিভিন্ন তরকারী এবং সুপে ব্যবহার করা হয় । ভারতে খাওয়া হয় , তবে চাষ হতে খুব একটা দেখা যায় না । বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে দেখা যায় কিন্তু বেশি মানুষে এটি খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে না । তেলাকুচো পাতা এবং ফল ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয় । এই গাছটি ভেষজ ব্যবহারের জন্য এর লতা , পাতা , ফল ও মূল ব্যবহার করা হয় । এটি সবজি হিসেবে খাওয়া হয় । এই গাছের ফল দেখতে অনেকটাই পটলের মতো এবং পাকা ফল দেখতে টকটকে লাল রঙের হয় এবং স্বাদ তেতো । এই গাছে সারা বছরই ফুল ফোটে । তবে বর্ষায় ফুলের প্রাচুর্য বেশি থাকে । ফুলের রং সাদা , তবে দেখতে অনেকটা লাউ ফুলের মতো । এই গাছের ফল এবং পাতার রস কুষ্ঠ , অ্যামাসা , জ্বর , জন্ডিস এবং ব্রঙ্কাইটিস রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।

তেলাকুচো পাতা স্বাদের পাশাপাশি অত্যন্ত পুষ্টিগুণ । বিশেষ করে ভিটামিন এবং মিনারেল সমৃদ্ধ এটি । এতে উপস্থিত রয়েছে আয়রন , ক্যালশিয়াম , ভিটামিন বি১ , ভিটামিন বি২ , ভিতামিন এ এবং সি । তাছাড়া রয়েছে প্রচুর বিটা – ক্যারোটিন । এই লতার পাতার রস ডায়াবেটিস রোগে বিশেষ উপকারী । এই গাছের ফল ফলভোগী পাখির প্রিয় । বিশেষ করে বুলবুলি , শালিক , বসন্তবৌড়ি , বেনেবউ ইত্যাদি এই পাকা ফলের লোভে সারাক্ষণ এই গাছের চারপাশে থাকে । তাহলে জেনে নেওয়া জাক তেলাকুচো পাতার ঔষধি গুনাগুন ।

জন্ডিস রোগে উপকারী — জন্ডিস হলে তেলাকুচো পাতার রস খুব উপকারী । জন্ডিস সারাতে এই গাছের মূল ছেঁকে রস তৈরি করে নিন । প্রতিদিন সকালে আধকাপ এই রস খেতে পারেন । ফলে উপকার পাবেন হাতেনাতে ।
পা ফোলা দূর করে — অনেকক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসে থাকলে ফলে পা ফুলে যায় একে বলে শোথ রোগ বলা হয় । এই রোগের সমাধান পেতে তেলাকুচোর পাতা বা মূল এর রস ছেঁকে ৩-৪ চামচ প্রতিদিন সকালে খেতে পারেন ।
পরিপাকতন্ত্র ভালো রাখে — তেলাকুচোর পাতায় এবং ফলে প্রচুর পরিমাণে আঁশ রয়েছে যা পরিপাকতন্ত্র ভালো রাখে । এটির রস খেলে মল বাড়ে এবং সফট হয় । ফলে গ্যাস্ট্রিক এবং আলসারজনিত সমস্যা কাটে ।

অরুচি ভাব দূর করে — তেলাকুচোর পাতা অরুচি ভাব দূর করতে খুব কার্যকরী । অরুচি ভাব দূর করতে প্রথমে তেলাকুচোর কয়েকটা পাতা এবং পরিমাণ মতো নুন দিয়ে একটু সিদ্ধ করে জলটা ফেলে দিন । এরপর এতে পরিমাণ মতো ঘি মিশিয়ে শাকের মতো রান্না করে নিন । খেতে বসে প্রথমেই এই শাক খেলে খাওয়াতে রুচি আসবে । এভাবে কয়েকদিন খেয়ে দেখুন অরুচি ভাব দূর হয়ে যাবে ।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে — তেলাকুচো ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুব উপকারী । এটি ডায়াবেটিস রোগকে নিয়ন্ত্রেণ রাখে । তেলাকুচোর কাণ্ডসহ পাতা ছেঁকে রস তৈরি করে নিন । নিয়মিত সকাল ও বিকাল আধকাপ এই রস খেয়ে নিন । এছাড়া এই পাতা রান্না করে খেলে ডায়াবেটিস রোগের উপকার মেলে ।
শ্বাসকষ্ট দূর করতে — তেলাকুচোর পাতা ও মূল শ্বাসকষ্ট দূর করতে বিশেষ উপকারী । শ্বাসকষ্ট দূর করতে প্রথমে তেলাকুচোর পাতা ও মূল থেকে রস ছেঁকে নিয়ে সেটাকে হালকা গরম করে নিন । এই রসের পরিমাণ হতে হবে ৩-৪ চামচ । প্রতিদিন সকালে ও বিকালে খান । প্রায় তিন থেকে সাত দিন খান শ্বাসকষ্টের সমস্যা মিটে যাবে ।

কাশি দূর হয় — কাশি দূর করতে তেলাকুচো পাতা খুব উপকারী । তবে যদি শ্লেস্মাকাশি হয় তাহলে শ্লেস্মা তরল করতে বেশ কাজ করে এটি । কাশি দূর করতে তেলাকুচোর পাতা এবং মূলের ৩-৪ চামচ রস হালকা গরম করে নিয়ে এর সঙ্গে আধা চামচ মধু মিশিয়ে খেতে পারেন । এবার এটি ৩ থেকে ৭ দিন সকালে ও বিকালে খাওয়ার অভ্যাস করুন । এতে খুস্খুসে কাশি সারতে বেশি দেরী লাগবেনা ।

ব্রন ও ফোঁড়া মুক্ত করে — ব্রন ও ফোঁড়া সারাতে এই পাতা জাদুর মতো কাজ করে । নিয়মিত সকাল এবং বিকালে তেলাকুচো পাতা থেঁতো করে বা পাতার রস ব্রনের ও ফোঁড়ার ওপর ব্যবহার করুন । এতে দ্রুত উপকার পাবেন ।