উজ্জ্বল সবুজ রঙের দারুণ সুস্বাদু বাদামটি নাম যে পেস্তা , এটা মোটামুটি সকলেই জানেন । দামটা বেশ চড়া হলেও বিশেষ উৎসবের পায়েস , সেমাই , পোলাওতে পেস্তার দেখা মেলেই । যারা পেস্তা বাদাম খান না , তাঁরাও কিন্তু চেনেন পেস্তা ফ্লেভারের আইসক্রিম । সব মিলিয়ে সুস্বাদু এই খাবারটি সাথে আমাদের সম্পর্ক কম দিনের নয় । আইসক্রিম হোক বা সন্দেশ , পেস্তা থাকলে স্বাদ হয়ে যায় দ্বিগুণ । পেস্তা এমনই এক সুস্বাদু বাদাম । কিন্তু এই পেস্তা বাদাম নিয়ে রয়েছে অনেক ভুল ধারণাও । অনেকেই ভাবেন পেস্তা বাদাম খেলে মোটা হয় , পেট খারাপ হয় । আবার খোসা ছাড়ানোর ঝক্কিও নিতে চান না কেউ কেউ । পেস্তা যে ওজন কমাতে সাহায্য করে তাই নয় । পেস্তায় রয়েছে অন্যান্য পুষ্টিগুণও । যে কারণে ডায়েটে পেস্তা রাখতে বলে থাকেন নিউট্রিশনিস্টারা ।

পেস্তা একধরণের শুকনো ফল । এর বৈজ্ঞানিক নাম পিস্তাসিয়া ভেরা । পেস্তা পুষ্টিতে সমৃদ্ধ একটি ফল যা আমাদের খাওয়ার মাধ্যমে শরীরে পুষ্টি উপাদানের অভাব দূর করে এবং ভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি থেকে প্রতিরোধ করে । হাল্কা সবুজ রঙের শুকোনো এই বাদাম রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে । এছাড়া ক্যান্সারের মত মারাত্মক রোগ থেকেও রক্ষা করে । এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত খাদ্যের মধ্যে অন্যতম । স্বাস্থ্যের পক্ষে পেস্তা খুব উপকারী । এটি বিশুদ্ধ রক্তকে শুদ্ধ করে । নিয়মিত পেস্তা বাদাম খেলে রোগমুক্ত হয় । এছাড়াও রয়েছে অনেক গুণাবলী ।

পুষ্টিগুণ – ফাইবার , প্রোটিন , অ্যান্টিঅক্সিডেণ্ট , ভিটামিন বি৬ , ক্যালসিয়াম অহারের পটাশিয়াম থাকার কারণে পেস্তা পুষ্টিগুণে ভরপুর এক খাবার । পেস্তাবাদামে রয়েছে মনো – আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট , যা কোলেস্টেরল লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী । প্রোটিনের একটা চমৎকার উৎস হচ্ছে পেস্তা । ফলে পেস্তা বাদাম হৃদরোগের ঝুঁকিও কমাতে কার্যকর । ফসফরাস , পটাসিয়াম , সোডিয়াম , কপার , ম্যাগনেসিয়ামের দারুণ উৎস হচ্ছে পেস্তা বাদাম । আদিকে এতে ফ্যাটের পরিমাণ পণ্য বাদামের চাইতে অনেকটাই কম । পেস্তা বাদামে লুটেন নামক এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেণ্ট রয়েছে যা বয়সের কারণে সৃষ্ট নানা শারীরিক সমস্যা যেমন – মাংসপেশির দুর্বলতা , চোখের ছানির সমস্যা প্রতিরোধে সহায়ক করে ।

পেট – পেস্তা খাদ্যনালীতে উপকারি ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে । ফলে পেট পরিষ্কার থাকে । কারণ , বাদামের আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেণ্ট । যে কারণে বাদামকে বলা হয় সুপারফুড । তাই এটি খেলে ওজন না বেড়েও শরীর সুস্থ থাকে। তাছাড়া এতে আছে ফাইবার , প্রোটিন , হেলদি ফ্যাট , ভিটামিন ও খনিজ থাকে ।
রক্তনালী – পেস্তা রক্তনালী এন্ডোথেলিয়ামের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে । এই এন্ডোথেলিয়াম ভ্যাসোডাইলেশন অর্থাৎ রক্তনালী সংকোচন , প্রসারেণের জন্য দায়ী ।

রক্তচাপ – রোজ ডায়েটে পেস্তা থাকলে তা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে । পেস্তা রক্তে এইচডিএল বা গুড কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়তে ও এলডিএল বা ব্যাড কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে ।
ওজন – এনার্জি জোগানোর পাশাপাশি যে কোনও বাদাম ওজন বশে রাখতেও সাহায্য করে । পেস্তারও রয়েছে এই গুন ।
স্বাদ – খেতে অসাধারণ । তাই পেস্তা মন ভাল করে । স্যালাডে গারনিশ করে , স্মুদি বানিয়ে বা পেস্তা আইসক্রিম খেলে স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মুডও ভাল হবে ।
স্বাস্থ্যের জন্য পেস্তার উপকারিতা – পেস্তা খাওয়ার দারুণ উপকারিতা রয়েছে । বিশেষজ্ঞদের মতে , পেস্তা খেলে এই সব উপকারিতা মেলে । দেখে নেওয়ায় যাক সেই তালিকা । পেস্তায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি – অক্সিডেণ্ট থাকে , যা বার্ধক্যজনিত সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে ।

হৃদয় সুস্থ রাখার জন্য ঃ নিয়মিত পেস্তা খেলে হৃদয় সুস্থ থাকে , হৃদরোগ সংক্রান্ত রোগগুলির প্রবনতা কম হয় । এটি পেশীর শক্তি বৃদ্ধি করে হার্টকে শক্তিশালী করে তোলে । পেস্তায় ওমেগা -৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায় যা হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় ।
হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি ঃ পেস্তা বাদামে উপস্থিত ভিটামিন বি৬ নামক প্রোটিনের উপাদান , যা রক্তে অক্সিজেন বহন করে । যদি প্রতিদিন এটা খাওয়া যায় তবে রক্তে হিমোগ্লোবিন এবং অক্সিজেনের পরিমান বৃদ্ধি পায় ।

জ্বলন থেকে রক্ষা ঃ এই বাদামে জ্বালা প্রতিরোধ করার গুণাবলী প্রচুর । পেস্তায় সমৃদ্ধ ভিটামিন এ , ভিটামিন ই এবং জ্বলন প্রতিরোধী ক্ষমতা হল যা শরীরের কোনও রকমের সমস্যায় হাত থেকে রক্ষা করে ।
ক্যান্সার থেকে রখা ঃ ক্যান্সার একটি মারাত্মক রোগ , যা সহজেই নিরাময় করা যায় না । কিন্তু আপনি যদি নিয়মিত পেস্তা বাদাম খান তাহলে আপনি এই মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচতে পারবেন । এই বাদামে উপস্থিত ভিটামিন বি৬ রক্তের কোষের সংখ্যা বাড়ায় ।

চুলের সমস্যা থেকে মুক্তি ঃ রোজ পেস্তা বাদাম চুলের সমস্যা দূর করে । এতে প্রচুর পরিমাণে ফ্যাট অ্যাসিড থাকে , যা চুলের গোঁড়া শক্তিশালী এবং ঘন করে তোলে । এই বাদাম ব্যবহার যে হেয়ার মাস্ক তৈরি হয় , তা আপনার ভেতর থেকে ময়শ্চারাইজ করে এবং চুলের পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে । এর পাশাপাশি চুলের আগা ফাটা এবং চুল পড়ার সমস্যা থেকে মুক্তি দেয় ।
ডায়াবেটিস থেকে রক্ষা ঃ পেস্তা বাদাম ডায়াবেটিসের মতো ভয়ঙ্কর রোগ থেকে রক্ষা করে । আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় ৬০ শতাংশ ফসফরাস পূরণ করে এক কাপ পেস্তা বাদাম । যা ডায়াবেটিস থেকে রক্ষা করে । পেস্তায় উপস্থিত ফসফরাস প্রোটিনকে অ্যামিনো অ্যাসিডে ভেঙ্গে দেয় , যার ফলে শরীরের গ্লুকজের শক্তি বৃদ্ধি করে ।

চোখের সমস্যা থেকে মুক্তি ঃ পেস্তা চোখের জন্যও খুব উপকারি এবং চোখের রোগের সমস্যা থেকে রক্ষা করে । এটি মাস্কুলার বিকৃতি থেকে রক্ষা করে , যা বৃদ্ধ বয়েসে চোখের সাধারণ সমস্যা এবং যার ফলে চোখের দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে যায় । পেস্তা বাদামে লুটিন এবং জ্যাক্স্যান্থিন নামক দুটি অ্যান্টিঅক্সিডেণ্ট সমূহ পাওয়া যায় , যা এই মুক্ত রেডিকেলসকে আক্রমণ করে এবং তাদের ধবংস থেকে রক্ষা করে ।
ওজন কমাতে সাহায্য করে ঃ পেস্তা বাদামে রয়েছে অ্যামিনো অ্যাসিড , যা অনেকক্ষণ ক্ষিধা নিবারণ করে । যার ফলে ওজন কমাতে সাহায্য করে । এছাড়াও পেস্তা ফাইবার সমৃদ্ধ যা দ্রুত খাবার হজম করতে সক্ষম ।

মস্তিস্কের স্বাস্থ্য উন্নত করে ঃ পেস্তার পুষ্টি উপাদান রক্তপ্রবাহে অক্সিজেন সরবরাহ করতে সাহায্য করে , এইভাবে শ্বেত কণিকা উৎপাদনে সাহায্য করে যা একটি ভালো ইমিউন সিস্টেমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ । এটি ভিটামিন বি৬ এর সমৃদ্ধ সামগ্রীর সাথে রক্তে হিমোগ্লোবিন এবং অক্সিজেনের উৎপাদনকে উন্নত করে । ফলে রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ যত ভাল হবে , মস্তিস্কের কার্যকারিতাও তত ভাল হবে ।

হাড়ের জন্য উপকারি ঃ পেস্তায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় যা হাড়ের জন্য খুবই উপকারি । প্রতিদিন সকালে খালি পেটে পেস্তা খেলে হাড় মজবুত হয় এবং আস্টিওপোরোসিসের মত গুরুতর সমস্যার ঝুঁকিও হ্রাস করে ।
সুস্থ ত্বকের জন্য ঃ স্বাস্থ্যকর চামড়ার জন্য ভিটামিন ই খুব প্রয়োজনীয় , যা পেস্তায় প্রচুর পরিমাণে রয়েছে । এতে থাকা তেলটি আপনার ত্বককে ময়শ্চারাইজ করে রাখে এবং শুস্কতার হাত থেকে রেহাই দেয় । এটি সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে । এটি ত্বক বৃদ্ধির বাধা দেয় এবং আপনাকে অল্প বয়স্ক দেখায় । পেস্তায় এমন কিছু উপাদান আছে , যা আমাদের সুরজের ক্ষতিকর ইউভি রশ্মির হাত থেকে সুরক্ষিত রাখে । এছাড়াও পেস্তা বাদাম আকাল বার্ধক্য প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে ।
–
কিভাবে খাবেন ——————- রাতে ছয় থেকে সাতটি পেস্তা বাদাম জলে ভিজিয়ে রাখুন । তারপর সকালে খালি পেটে দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খান । খালি পেটে খেলে বাদামের পুষ্টিগুণ শরীরে তাড়াতাড়ি কাজ করে এবং হজমও হয় তাড়াতাড়ি । লবণ দিয়ে ভাজা বাদাম বা প্রক্রিয়াজাত করা বাদাম খাবেন না । বাদামের ওপরের খোসাটা ছাড়িয়ে খান । কাঁচা চিবিয়ে খেতে পারলেই সবচাইতে ভালো । তা না হলে ক্ষীর বা মিষ্টি কোনো খাবারের সঙ্গে খান । পেস্তা বাদাম বেটে দুধের সঙ্গে মিশিয়েও খেতে পারেন ।