স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । কারণ , অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং মানসিক চাপের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার রোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে । তাই , আজকাল অনেকেই সুস্থ শরীর নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন ধরণের তেল বেছে নেয় । খাবার রান্না করার সময় তেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । তেমন একটি সরষের তেল যা ‘সরসো কা তেল ‘ নামে পরিচিত । ভারতীয় রান্নাঘরে এটি সাধারণভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে । হাজার হাজার বছর ধরে , সরিষার বীজ সারা বিশ্বের রান্নার প্রধান উপাদান । সরিষা বাঁধাকপি , কালে , ব্রকলি শ পুষ্টিকর -ঘন ক্রুসিফেরাস উদ্ভিদ পরিবারের অন্তর্গত । সরিষা গাছের পাতা আবিং বীজ দুই রন্ধনসম্পর্কীয় এবং ঔষধি গুন প্রদান করে । নিয়মিত সরষের তেল দিয়ে রান্না করা খাবার খেলে তা শরীরের একাধিক উপকার হয় এবং আয়ুও বাড়ে ।

সরিষার তেল প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে । প্রকৃতপক্ষে , ভারতে এটি খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সাল থেকে বিদ্যমান বলে জানা যায় । এই তেলটি পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বের করা হয় । এটি সাদা সরষে , কালো সরষে আথবা বাদামী সরষে থেকে বের করা যেতে পারে । সরিষার বীজ থেকে তৈরি সরিষার তেল বহু শতাব্দী ধরে অনেক রান্নাঘর এবং ওষুধের আলমারিতে একটি প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে । এই তেল স্বাদ এবং সুবাসের জন্য পরিচিত । সরষের তেল পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকর উপকারিতা ছাড়াও , এটি ম্যাসাজ , চুলের যত্ন , এবং এমনকি প্রাকৃতিক সংরক্ষণকারী হিসেবেও দৈনন্দিন ব্যবহারের কাজে লাগে ।

এই বহুমুখী তেল কেবল রান্নার উপাদান নয় । এটি প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণে ভরপুর । সরষের তেলে প্রচুর পরিমাণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে , যা এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আরও বাড়িয়ে তোলে । সরষের বীজে তামা , আয়রন , ফসফরাস , ম্যাঙ্গানিজ , ক্যালসিয়াম , সোডিয়াম , ভিটামিন ই এবং কে , পটাশিয়াম , জিঙ্ক , ম্যাগনেসিয়াম এবং সেলেনিয়ামের উচ্চ মাত্রা রয়েছে । এছাড়া সরষের বীজে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার এবং উপকারী বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ , যেমন অ্যান্টিঅক্সিডেণ্ট এবং পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে । এতে ওমেগা -৩ ফ্যাটি অ্যাসিড , ওমেগা -৬ ফ্যাটি অ্যাসিড উভয়ই প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায় । খাবারের স্বাদ আনার পাশাপাশি শরীরের জন্য সরষের তেলের প্রচুর উপকারিতা রয়েছে । এতে অ্যান্টিফাঙ্গাল , অ্যান্টিভাইরাস , অ্যান্টিব্যাকটেরিয়া এবং অ্যান্টি – ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে ।

সরষের তেলের পুষ্টিগুণের পাশাপাশি , এর অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে । আর এই ব্লকে আমরা স্বাস্থ্যের জন্য সরষের তেলের কিছু উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করব ।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে ঃ এতে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ এবং ওমেগা -৬ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে । সরষের তেলে থাকা এই ফ্যাটি অ্যাসিড খারাপ কোলেস্টেরল মাত্রা কমাতে এবং ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি রাখতে সাহায্য করে । ফলে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রেস সহ হৃদরোগের ঝুঁকি কমে । তাই নিয়মিত আপনার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন ।
ক্যান্সার প্রতিরোধ করে ঃ সরষের তেল লিনোলেনিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ , যা ক্যান্সার বিরধি প্রভাব ফেলে । সরষের বীজে থাকা অনন্য যৌগের কারণে ক্যান্সার বৃদ্ধি রোধ করতে সাহায্য করতে পারে । এই বীজগুলিতে গ্লুকোসিনোলেট এবং মাইরোসিনেজ রয়েছে যা ক্যান্সার কোষগুলি গঠন এবং বিস্তারকে বাধা দিতে পারে । একটি গবেষণা অনুসারে , সরষের তেকে থাকা সালফোরাফেন ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক প্রভাব ফেলে ।
হজমে সাহায্য করে ঃ পিত্ত এবং গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিডের মতো হজম রস নিঃসরণে সাহায্য করে , যা পুষ্টিগুলিকে ভেঙ্গে শরীরে শোষিত হতে সক্ষম করে এই তেল । হজম প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি , সরষের তেল পাচক রসের উৎপাদন বৃদ্ধি করার ক্ষমতা রাখে । এছাড়া , এই তেল বদহজম এবং পেট ফাঁপা হওয়ার মতো গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা এড়াতে সাহায্য করে ।
খিদে বাড়ায় ঃ সরষের তেল খিদে বাড়ায় এবং যারা ওজনের এবং অপুষ্টিতে ভুগছেন তাদের জন্য খুব উপকারি । এটি হজম রস নিঃসরণে সাহায্য করে এবং খিদের অনুভব করায় । এটি আপনাকে আরও বেশি খেতে উৎসাহিত করে ।

শরীরে প্রদাহ কমায় ঃ সরষের তেলে উপস্থিত অ্যান্টি – ইনফ্লেমেটরি উপাদান, যে কোনো ধরনের প্রদাহ কমারে বিশেষ ভূমিকা রাখে । মাথা যন্ত্রণা এবং তলপেটের অস্বস্তি কমাতে এই প্রাকৃতিক উপাদানটি দারুণ কজে আসে ।
স্মৃতিশক্তি বাড়ায় ঃ সরসের তেলে উপস্থিত স্বাস্থ্যকর ফ্যাত স্মৃতিশক্তি বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে । সেই সঙ্গে মনোযোগ বৃদ্ধি এবং সার্বিকভাবে মস্তিস্কের কর্মক্ষমতার উন্নতিতেও সাহায্য করে ।

হাড়ের ব্যথা থেকে মুক্তি দেয় ঃ শরীরে হাড়ের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে সরষের তেলের ব্যবহার করতে পারেন । আদা আর সরষের তেল এই দুটোতে এমন উপাদান থাকে যা প্রদাহজনিত উৎসেচকের ক্রিয়ার গতি কমিয়ে দেয় । ফলে ব্যথা থেকে আরাম পাওয়া যায় । জয়েন্টেের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে সরষের তেল পরিমাণ মতো কর্পূর মিশিয়ে নিন । এরপর তেলটা গরম করে ঠাণ্ডা হতে দিন । এবার এই তেল দিয়ে মালিশ করুন । উপকার পাবেন হাতেনাতে ।
মাইগ্রেনের কষ্ট কমায় ঃ সরষের তেলে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে , মাইগ্রেনের কষ্ট কমাতে দারুণ কাজে আসে । তাই এই তেল দিয়ে রান্না করা খাবার খেলে মাইগ্রেনের কষ্ট কমে যায় । সরষের তেল দিয়ে মাছ ভাজা খেলে শরীরে ওমেগা -৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় । ফলে অনেক ধরনের রোগে অক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায় ।