এটি একটি লতানো গাছ । যার নাম হল গন্ধভাদাল পাতা বা গাঁদাল পাতা । এর ইংরাজি নাম – Skunkvine , Stinkvine । এর বৈজ্ঞানিক নাম – Paederia Foetida । এই পাতার সম্পর্কে অনেকেই জানেন না । শহরাঞ্চালের মানুষের কাছে এই পাতা বেশি পরিচিত না হলেও গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে এই পাতা বেশি পরিচিত । গাঁদাল পাতার সংস্কৃত প্রসারণী , ভদ্রা । গাঁদাল পাতা বা চাইনিজ ফিভার ভাইন একটি লতা -সদৃশ উদ্ভিদ যেটি আয়ুর্বেদিক ভেষজ ব্যবহার করা হয় । বনে – জঙ্গলে বা রাস্তার ধারে জন্মায় এই লতানো গাছ । এই গাছের পাতার অনেক ঔষধি গুন রয়েছে যা শুনলে আপনি চমকে যাবেন ।
গাঁদাল পাতার গন্ধের জন্যে অনেক মানুষই একেবারে এই পাতা পছন্দ করে না । এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন – গাঁদাল , রাজবালা , সরণী ইত্যাদি । এর গন্ধের জন্য গাঁদাল পাতার অপর নাম ‘পুতিগন্ধ’ । এর উৎকট গন্ধের কারনে এই পাতার নামকরণ করা হয়েছে গাঁদাল পাতা । এই পাতার বাজে গন্ধের জন্য সকলে এড়িয়ে গেলেও এই পাতা রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা অপরিসীম । এই গাছ বাংলাদেশে , ভারতের পূর্বাঞ্চালন , আন্দামান নিকবোর , কম্বোডিয়া , চীন , মায়ানমার , দক্ষিণ ভুটান , তাইয়ানে প্রচুর জন্মায় এই গাঁদাল পাতা ।

এই গাছ লতানো বলে , সাধারনত অপর কোনো গাছে বা বাগানের বেড়ায় দেখা যায় । কাণ্ড থেকে জোড়ায় জোড়ায় পাতা বের হয় । এই গাছের পাতা কচিপাতা নরম ও সবুজ হয় কিন্তু পাতা পরিপক্ক হলে খসখসে হয় । তবে এই গাছের জন্য আলাদা মাচা করে দিলে এই গাছ আরও ভালো হয় । সেপ্টেম্বর – অক্টোবর মাসে এই গাছে ফুল ধরে এবং নভেম্বর – ডিসেম্বর মাসে ফল হয় । শীতকালে এই গাছের ফল পাকে । এই গাছের বীজ বা কাণ্ডের মাধ্যমে নতুন গাছ হয় । এই পাতাটি বিশ্রি গন্ধ হলেও এটি শরীরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রোগের নিরাময় করে । আগের দিনের মা ঠাকুমারা পেটের গোলমাল হলেই তাঁরা এই পাতার ঝোল খাওয়াতো ।

গাঁদাল পাতা স্বাস্থ্যকর । এটা ডায়রিয়া নিরাময়ে অনেক বেশি কার্যকর । আবার বাতের ব্যথার জন্য এই পাতাটি অনেক বেশি উপকারী । বিশেষত পেটের সমস্যায় এই পাতা উপকারী । এই উদ্ভিদের অ্যান্টিভাইরাল এবং অ্যান্টিব্যাক্তেরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে । এটি ঠাণ্ডা এবং ফ্লু নিরাময়ে সাহায্য করে । এই পাতা ভর্তা করে গরম ভাতের সাথে খেলে উপকার মেলে । আমাশয় , অর্শ , অর্জীন , কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে বিশেষ উপকারী । আসুন জেনে নিই এই পাতার কিছু উপকারিতা সম্পর্কে ।
১। আমাশায় দূর করে – – গাঁদাল পাতা আমাশায় দারুণ কার্যকরী । যারা আমাশায় ভুগছেন তাদের জন্য থাকল একটি উপায় । গাঁদাল পাতার রস দু- চামচ হালকা গরম করে নিন । এরপর তাতে ১০ ফোঁটা মধু মিশিয়ে খেলে দারুণ উপকার পাওয়া যেতে পারে । তাতে আমাশার হাত থেকে চিরতরে মুক্তি মিলবে ।
২। অর্শ কমায় — এই পাতা অর্শের সমস্যা দূর করতে ধন্বন্তরি । তিন গ্রাম কাঁচা হ্লুদের সঙ্গে দুই চামচ পাতার রস খেলে দু- একদিনে অর্শের যন্ত্রণা কমে যায় । এই পাতার রস নিয়মিত খেলে পুরোপুরি অর্শের সমস্যা সমাধান পাওয়া যায় ।

৩। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে — গাঁদাল পাতার রসের সঙ্গে অল্প লবণ মিশিয়ে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হতে পারে ।
৪। মূত্রনালির কষ্ট দূর করে — মূত্রনালির প্রদাহের সমস্যাও যন্ত্রণাদায়ক । সেক্ষেত্রে পাতার রসে ৩ থেকে ৪ চামচ কাঁচা দুধ মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যাবে ।
৫। বাতের ব্যথা কমে — এই গাঁদাল পাতা বাতের ব্যথাতেও আরাম দেয় । গাঁদাল পাতার সঙ্গে ক্যাস্টার অয়েল মিশিয়ে ব্যথা জায়গায় ভালো করে মালিশ করুন । এছাড়াও আমবাতের সমস্যাও দূর করে এই পাতা । গাঁদাল পাতার রসের সঙ্গে এক কোয়া রসুন মিশিয়ে খেলে দূর হয় আমবাতের সমস্যা ।

৬। অঙ্গ সচল করতে সাহায্য করে — শরীরে কোনও অঙ্গ অবশ হয়ে গেলে গাঁদাল পাতার রস খেলে বা ওই স্থানে গাঁদাল পাতা মালিশ করলে আস্তে আস্তে সচল হয় অঙ্গ ।
৭। পেটের সমস্যা দূর করে — সকালে সামান্য লবণ মিশিয়ে এই পাতা খেলে পেট ফাঁপা এবং গ্যাসের সমস্যা দূর হয় । এই পাতা ইউরিন সমস্যা দূর করতে পারে । তার জন্য দুধের সঙ্গে ৫ চামচ পাতার রস মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায় । এছাড়া দাঁতের ব্যথায় থেঁতো করে এই পাতা লাগালে ব্যথা কমে যায় ।
কাঁচা পাতার রস ছাড়াও এই পাতা কাঁচা কলা দিয়ে ঝোল , ব্যাসন দিয়ে বড়া করে খাওয়া যেতে পারে । বড়া খুবই সুস্বাদু ও উপকারী ।